গোদনা চিত্রকর্ম: একজন দলিত নারীর প্রতিরোধের শিল্প

মেঘা মালাকার

Translation from English to Bengali by Mansura Akter

“গোদনা শিল্পীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা”, @silkvarpatti দ্বারা গোদনা-অনুপ্রাণিত আর্ট, ২০২১

মূলধারার শিল্প ও সংস্কৃতিতে “উচ্চ”-বর্ণ এবং “উচ্চ”-শ্রেণীর সম্প্রদায়ের আধিপত্য ও একচেটিয়া অধিকার পরিলক্ষিত হয়েছে। তাদের শিল্পের জন্য কেবল বিপুল সমর্থনই নয় বরং শিল্পকর্ম বিক্রির বাজারেও তাদের বড় প্রভাব রয়েছে যার ফলে ধনী সম্প্রদায় আরও ধনী হয়। উদাহরণস্বরূপ, মধুবনী এবং মিথিলা শিল্পকলাগুলি হলো জনপ্রিয় ভারতীয় মূলধারার শিল্পকর্ম যা ভারতীয় সংস্কৃতি এবং গৌরবের প্রতিনিধিত্ব করে।

যাহোক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিকল্প কিছু শিল্পকর্ম রয়েছে যা খুব কমই আলোচনায় আসে। এই প্রবন্ধে গোদনা চিত্রকর্ম নামে এমনই একটি শিল্প সম্পর্কে অনুসন্ধান করা হয়েছে।

গোদনা চিত্রকরমগুলি দলিত নারীদের দ্বারা তৈরি যারা বর্ণ, লিঙ্গ এবং দারিদ্র্যের ত্রিমুখী বৈষম্যের সম্মুখীন এবং তাই কখনই তাদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। দলিত নারীরা অন্যান্য বর্ণের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব বর্ণের পুরুষদের দ্বারা বৈষম্য, নিপীড়ন এবং পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। তাই একটি শিল্পকর্ম তৈরি করা এবং তা জনপ্রিয় করা প্রতিরোধ, প্রতিবাদ এবং একটি উন্নত ভবিষ্যতের প্রত্যাশার প্রতীক যেখানে দলিত নারীরা স্বাধীন এবং স্বনির্ভর হওয়ার পথে এগিয়ে যেতে পারে।

১৯৭০ সালে, জার্মান নৃতাত্ত্বিক, এরিকা মোসার বিহারের জিতওয়ারপুর গ্রামে একটি দুসাধ দলিত সম্প্রদায়ে গমন করেন এবং সেখানকার দলিত নারীদের আর্ট ও চিত্রকর্ম শুরু করার পরামর্শ দেন, যাতে তারা কিছুটা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করতে পারে। এই মিথিলা অঞ্চলে, ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ নারীদের তৈরি আর্ট আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিল এবং তাদের আর্টের রূপটি ছিল শ্রেষ্ঠ মিথিলা চিত্রকর্ম।

১৯৭০ সালে মোসারের সাথে এই মিটিং-এর পরই গোদনা বা ট্যাটু পেইন্টিং নামে একটি নতুন ধরনের শিল্পের উদ্ভব ঘটে এবং প্রথমবারের মতো এই দলিত শিল্পকর্মটিকে জনপ্রিয় করে তোলে। যদিও মিথিলা এবং অন্যান্য “উচ্চ”-বর্ণের চিত্রকর্মগুলি বেশিরভাগ ঐশ্বরিক বিষয়বস্তু নিয়ে ছিল এবং শাস্ত্রীয় দৃশ্যগুলিকে চিত্রায়িত করত, দলিতদের “অস্পৃশ্য” হিসেবে এই ভক্তিমূলক বা ঐশ্বরিক শিল্পকর্মগুলি অনুশীলন করতে বাধা দেওয়া হতো। তাই এই নারীরা তাদের আর্টের জন্য ঈশ্বরকে ছেড়ে প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। তারা গাছপালা, প্রাণী, পাখি এবং নদী আঁকেন — এমনসব জিনিস যা তাদের চারপাশে সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক জগত যার সাথে তাদের নিত্যদিনের সম্পর্ক।

এই সম্প্রদায়গুলিতে ট্যাটু শিল্প হিসেবে গোদনা চিত্রকর্ম কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। দলিত নারীরা তাদের শরীরে একই ধরনের ট্যাটু আঁকতেন। এটিও একটি ঐতিহ্য যা তাদের বর্ণের মর্যাদা থেকে উঠে এসেছে। দলিতদেরকে অলঙ্কার দিয়ে সাজতে দেওয়া হতো না। এগুলি “উচ্চ”-বর্ণের জন্য সংরক্ষিত ছিল। তাই দলিত নারীরা ট্যাটু দিয়ে নিজেদেরকে সাজাতেন।

মোসারের সাথে সাক্ষাতের পর, এই নারীরা তাদের ট্যাটুগুলিকে অন্য ক্যানভাসের উপর করতে শুরু করেন এবং তাদের শৈল্পিক ধারণাগুলিকে আরও সম্প্রসারিত করেন। এমনকি তারা গোবরের মতো উপকরণ ব্যবহার করে ক্যানভাস তৈরি করতে শুরু করেছিলেন যার উপর তারা আঁকতেন। “উচ্চ”-বর্ণের ঐতিহ্যের সাথে মিলিয়ে, দলিতরাও উজ্জ্বল রং ব্যবহার করেন এবং এই রংগুলি সাধারণত প্রাকৃতিক উৎস — হলুদ, ফুল, পাতা, বাকল এবং অন্যান্য কালি জাতীয় পদার্থ থেকে পাওয়া। এই পদ্ধতিগুলি গোদনা আর্টকে আরও সমৃদ্ধ করে এবং একে এক অনন্য শৈল্পিক নান্দনিকতা দেয়।

গোদনা চিত্রকর্ম এখনও একটি কম পরিচিত শিল্প। এই শিল্পের অনুশীলনকারী দলিত শিল্পীরা এখনও বাজারে ভালো মূল্য পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এই শিল্প এবং এর ইতিহাস এখনও তাদের প্রাপ্য সমাদর এবং স্বীকৃতি পায়নি যেটি পাওয়া তাদের উচিত ছিল।

এতদসত্ত্বেও, লোকেরা গোদনা শৈলীতে আঁকতে থাকে কারণ এই শিল্পে প্রতিরোধের একটি গভীর দিক রয়েছে। দলিত নারীদের ট্যাটু আঁকার শিল্পরূপটি শুধুমাত্র নিম্ন পদের শিল্প প্রকাশের একটি রূপ নয় বরং জাত-বর্ণ ও নিপীড়ন নির্মূলের প্রতীকও হয়ে উঠেছে। অতীতে, বর্ণ চিহ্নিতকরণের প্রতীক হিসেবে ট্যাটুগুলি দলিত নারীদের উপর চাপানো হয়েছিল কিন্তু একই ট্যাটু পুরো সম্প্রদায়ের জন্য প্রতিরোধ এবং গৌরবের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তারা এখন সফলভাবে শিল্পের মাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশ এবং প্রতিরোধ করার জন্য একটি জায়গা তৈরি করেছে। গোদনা শিল্প বর্ণপ্রথা নির্মূলের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য তাদের আত্মমর্যাদা এবং গৌরব পুনরুদ্ধারের একটি ভিন্ন ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনা উন্মুক্ত করেছে।

মেঘা মালাকার নিজেকে একজন স্বতন্ত্র দলিত নারী হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং বর্তমানে টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস (TISS), মুম্বাই, ভারত থেকে সমাজকর্মে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিচ্ছেন। তার লক্ষ্য হলো তার সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর প্রসারিত করার জন্য প্ল্যাটফর্মগুলি ব্যবহার করা। মেঘা লেখালেখি, জাপানি অ্যানিমে দেখা, এছাড়া ভ্রমণ এবং বিভিন্ন স্থান এবং সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা নিতে পছন্দ করেন।

Redefining the History of the Subcontinent through a Dalit lens. Participatory Community History Project

Redefining the History of the Subcontinent through a Dalit lens. Participatory Community History Project