মূকনায়কের বৈপ্লবিক সাংবাদিকতা

লিডিয়া জয়কুমার

Translation from English to Bengali by Kanej Roksana

মূকনায়কের প্রথম পাতা, ৩১ জানুয়ারী ১৯২০, ছবি-উইকিমিডিয়া কমন্স

ডক্টর বি আর আম্বেদকর প্রতিষ্ঠিত মূকনায়ক ১০১ বছর আগে ১৯২০ সালের ৩১ জানুয়ারী প্রথম প্রকাশিত হয়। মূকনায়ক, যার আক্ষরিক অনুবাদ ‘বাকহীনদের নেতা’ মারাঠীতে লেখা হতো এবং বোম্বের উপকন্ঠে প্যারেল নামে শ্রমিক শ্রেণীর বসতি থেকে পাক্ষিক হিসেবে প্রকাশিত হতো।

দেশীয় রাজ্য কোলহাপুরের মহারাজ ছত্রপতি শাহুজী প্রাথমিকভাবে ২,৫০০ রুপি দিয়ে সংবাদপত্রটি প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেন।

সেই সময়ে মূলধারায় প্রচলিত ব্রাহ্মণ্যবাদর সরাসরি বিপরীত আদর্শ লালন করতো মূকনায়ক। ১৯২০ সাল বর্ণ-বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের জন্য এক পরিবর্তনকারী সময় ছিল। বর্ণ-বৈষম্য আন্দোলন দেশটিতে তখন গণ ভিত্তি পেয়েছিল। দলিত মুক্তি আন্দোলন দেশের বিভিন্ন অংশে বিস্তৃত হয়েছিল। অসংখ্য আন্দোলনের মধ্যে পাঞ্জাবে আদ-ধর্ম আন্দোলন, মহারাষ্ট্রে মাহরদের গণ-অভ্যূথ্থান, বাংলায় নমঃশূদ্র আন্দোলন, তামিলনাড়ু’র আদী-দ্রাবিড় আন্দোলন উল্লেখযোগ্য ছিল। এই আন্দোলনগুলোতে কখনো কখনো সহিংস প্রতিশোধের ঘটনা ঘটতো যাতে দলিত সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ বর্ণের সহিংসতার পূর্ণ প্রদর্শন হতো।

এতকিছু সত্বেও সেই সময়ের সংবাদপত্রগুলো বর্ণ বৈষম্য বা অস্পৃশ্যতা বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকার করেছিল। গণমাধ্যমে দলিতদের কণ্ঠের জন্য কোন জায়গা ছিল না। ডক্টর আম্বেদকরও সেই সময়ের সাংবাদিকতায় বর্ণ-ভিত্তিক পক্ষপাতের প্রচলন দেখেছিলেন। তিনি একে সংবাদপত্রের পুরানো দিনের পক্ষপাতমূলক মনোভাব তথা সুপ্রাচীন প্রচলিত পছন্দনীয় আচরণ বলে উল্লেখ করেছেন।মূকনায়ক এর প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে তিনি লিখেছেন-

“আমরা যদি বোম্বে প্রেসিডেন্সি’তে প্রকাশিত হওয়া সংবাদপত্রের উপর ভাসা ভাসা দৃষ্টিও দেই তাহলে দেখব এর মধ্যে অসংখ্য পত্রিকা কিছু (উঁচু) বর্ণের স্বার্থ রক্ষায় উদ্বিগ্ন। অন্যান্য বর্ণের স্বার্থের জন্য এরা কম যত্নশীলও হতে পারে না। এতেই শেষ না। কখনো কখনো তারা অন্য বর্ণের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়।” (মূকনায়ক পৃষ্ঠা ৩৪)

একই সময়ে ডক্টর আম্বেদকর সত্যিকারের সামাজিক পরিবর্তন লাভের জন্য গণমানুষকে শিক্ষিত ও সংঘঠিত করতে সংবাদপত্রের গুরুত্ব বিষয়ে জানতেন। মূলধারার বর্জনের পরিবেশই মূকনায়ক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। মূকনায়কের মাধ্যমে তিনি একটি বিকল্প গণমাধ্যমের আদর্শ কল্পনা করেছেন এবং তা সৃষ্টি করেছেন যাতে সেই সময়ের নিপীড়িত শ্রেণীর মানুষরা লিখেছে আর তাদের জন্য সেটি সৃষ্টি করা হয়েছে।

সেই সময়ের মূলধারার সংবাদপত্র মূকনায়ককে স্বাগতম জানায়নি। বাল গঙ্গাধর তিলক এর সংবাদপত্র ‘কেসারি’তে মূকনায়কে’র প্রথম সংখ্যার বিজ্ঞাপন প্রকাশ করার বিষয়টি সরাসরি প্রত্যাখান করা হয়। এর বদলে তথাকথিত মূলধারার সংবাদপত্রের মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল সরাসরি ব্রিটিশবিরোধী ঔপনিবেশিক এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। দলিত এবং অন্যান্য নিপীড়িত শ্রেনীর প্রতিবাদকে দেশটির সামাজিক যূথবদ্ধতার জন্য বিভেদ এবং আঘাতের প্রচেষ্টা বলে মনে করা হতো।

এত কিছুর পরেও মূকনায়ক পাঠকদের মধ্যে সফল হয়েছিল। ১৯০০ সালের গোঁড়ার দিকে নিপীড়িত গোষ্ঠীগুলোর প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য মূকনায়কের সংখ্যাগুলো গুরুত্বপুর্ণ ত সম্ভার।

মূকনায়ক পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবেদন করেছিল কিন্তু বর্ণ প্রথা বিরোধী প্যান্-ইন্ডিয়ান বিক্ষোভের দিকেও এর দৃষ্টি ছিল। সংবাদপত্রটি ১৯২০ সালে ডিপ্রেসড ক্লাসেস এর মারগাঁও ও নাগপুরে সংঘটিত হওয়া দুটি সম্মেলনের প্রতিবেদন করে। নারী অধিকার, ধর্ম, এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নিয়ে বিতর্কিত বিষয়ে এটি সাহসী ও আমূল পদক্ষেপ গ্রহন করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, গান্ধী’র ‘স্বরাজ’ নিয়ে ডক্টর আম্বেদকর সংবাদপত্রে সমালোচনা করেছিলেন।

যদি স্বরাজ এর মানে বৃটিশ শাসন থেকে মুক্তিলাভ হয়, তাহলে যারা ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে মুক্তিলাভ করতে চান তার মানে কি হবে বলে তিনি প্রশ্ন করেন । মূকনায়ক মুক্তির এমন এক আদর্শ তৈরি করে যা জাতীয়তাবাদীদের স্বাধীনতা সংগ্রামের চেয়ে অধিক গভীর ছিল। সংবাদপত্রটি বর্ণপ্রথাকে সম্মুখে এবং কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

যদিও ডক্টর আম্বেদকর মূকনায়কের আনুষ্ঠানিক সম্পাদক ছিলেন না তারপরেও মনে করা হয় তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্স থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী নেওয়ার জন্য ভারত ত্যাগের পূর্বে সংবাদপত্রটির ১২টি সংখ্যা সম্পাদনা করেছেন। আর্থিক সমস্যা এবং নিপীড়িত বর্ণ গোষ্ঠীর সদস্যদের দ্বারা সংবাদপত্রটি পরিচালিত হওয়ায় অনবরত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে মূকনায়ের জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এটি ১৯২২ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ডক্টর আম্বেদকরের সাংবাদিকতা পেশা এখানে শেষ হয়ে যায়নি। তিনি বাহিশক্রু ভারত (১৯২৭-২৯), জনতা (১৯৩০-৫৬) এবং প্রবুদ্ধা ভারত (১৯৫৬) নামে আরো তিনটি সংবাদপত্র সৃষ্টি করেন।

ক্ষুদ্র জীবন সত্বেও মূকনায়ক দলিত সম্প্রদায়ের দাবী প্রকাশের একটি যুগের নিদর্শন প্রকাশ করে এবং ভবিষ্যতে বর্ণ প্রথা বিরোধী লেখা ও রাজনীতির ভিত্তি তৈরি করে।

লিডিয়া জয়কুমার একজন লেখক। তিনি কাস্ট এন্ড ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ বিষয়ে কাজ করতে আগ্রহী। সম্প্রতি তিনি সেইন্ট স্টিফেন’স কলেজ, দিল্লী, ভারত থেকে স্নাতক হয়েছেন।

Redefining the History of the Subcontinent through a Dalit lens. Participatory Community History Project

Redefining the History of the Subcontinent through a Dalit lens. Participatory Community History Project